Blog

গায়ে হলুদ রঙের ফার কোট, যত্ন করে কাটা চুল, শান্ত মুখের মেয়েটিকে দূর থেকে দেখে মনে হলো যেন প্রিয় কোন সিনেমার চরিত্র। মার্গট। এদিকে ‘বার্নস এন্ড নোবেল’ এ বেশ মানুষ। ক্যাফেটেরিয়ায় ভিড়। সোশ্যাল ডিস্টেন্সিংয়ের চোখ রাঙ্গানি দেখিয়ে দূরে দূরে চেয়ার-টেবিল। প্রতিটি টেবিলে, সিঁড়ির পাশে দেয়ালে, বিল কাউন্টারে বার বার লিখে দেওয়া,
“৩০ মিনিটের মাঝেই ভেগে যান, প্লিইইজ।”
দু’বার চক্কর কেটেও একটা চেয়ার খালি পাওয়া যায়নি বলে আমি তখন ব্যাকপ্যাক কাঁধে ঘুরঘুর করছি ক্লাসিক আর নন-ফিকশন শেলফের অলি-
গলিতে। বাইরে মেঘ, অবনত আকাশ। কাচের ওপারে আভোকাডো রঙের বেঞ্চ। এদিকে ফার কোট পরা মার্গট ঘুরে ঘুরে বই দেখে আর আমি মাঝে মাঝে দেখি ওকে।
শেলফের একেকটা নানন্দিক মলাটের বইয়ের দাম এত যে নিজের জন্য নয় বরং কাউকে উপহার দেওয়ার জন্যই শুধু এইসব বই কিনতে ইচ্ছে করে। কারণ, নিজের জন্য আছে পুরানো বইয়ের অ্যান্টিক শপ, থ্রিফট বুকস আর ‘না কিনলেই রিসাইকেলে দিয়ে দেব’ হুমকি দেওয়া খ্যাপাটে দোকান।
মিনিট বিশেক পর কেমন যেন ফাঁকা হয়ে আসে ক্যাফেটেরিয়া। বাইরে ততক্ষণে পড়ন্ত বিকেল। একটা কফি আর কুকি বেছে নিতেই সময় চলে যায় অনেকটুকু। কাউন্টারের অন্যপাশে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে বিল দেওয়ার সময় আন্ডারকভার স্পাইদের মতো গলা নামিয়ে বলি,
‘৩০ মিনিটের মাঝে টেবিল কি ফাঁকা করতেই হবে?’
মেয়েটি ফিক হেসে ফেলে, এরপর বলে- ‘অনেক ভিড় না হলে যতক্ষণ ইচ্ছে বসো।’
আমি কফির কাপ, কুকির প্যাকেট ও ব্যাগপ্যাক নিয়ে আয়োজন করে বসি। আর মার্গট হেলেন টেনেনবাম। দত্তক নেওয়া, চেইনস্মোকার, লিটেরারি জিনিয়াস মেয়েটি সামনে দিয়ে হেঁটে যায় কিন্তু হাসে না একবারও। তারপর বারাক ওবামার ‘দ্য প্রমিস ল্যান্ড’ এর পোস্টার ছাপিয়ে হাঁটতে থাকে দূরের সিটি লাইটের দিকে।
অথচ মার্গট ভেবেছিল এককালে মাথায় টুপি পরা ছোট্ট বালিকাটির মতো সেও জানাবে সব কথা।
জানাবে অক্ষরে অক্ষরে।
জানাবে, কেন এখনও আধখানা মানুষ হয়ে বেঁচে আছে মোহাম্মদপুরের লাল ডুরে শাড়ি
কেন রস, রক্ত, মাংস, অস্থি, মেদ, মজ্জা আর শুক্র ছাপিয়ে চাঁদ উঠেছে দেরিতে,
জানাবে, ডেইজি ফুলের কত রঙ
পেঙ্গুইন কেন হাঁটে মাতালের মতো,

আর প্রিয়তম ভিনসেন্ট আসলে হলুদ রঙে এঁকেছিল কাকে…

কিন্তু এইসব কিচ্ছু না জানিয়ে মাথার ভেতরের আস্ত এক শহর বাঁচানোর নামে মার্গট হারালো গোলকধাঁধায়। প্রিয়জন খুঁজতে গিয়ে হারালো আঙুল। দস্তয়ভস্কি যেমন বলেছিল, “মানুষ যাকে আবিষ্কার করেছিল, তার দ্বারাই হয়েছিল পরিত্যক্ত” ঠিক তেমন।

তাই, মার্গট কখনও কাঠের আঙুল দিয়ে টেবিলে টোকা মেরে যায়।
মার্গট হাঁটে ওকলাহোমা স্ট্রিটে,
স্কোরপিয়নসের সাথে নীল অন্ধকারে।
মার্গট কখনও ফড়ফড় করে ডানা ঝাপটায়, আর কখনও বলে,
‘আমরা হতে চাই জয়ী,
সবার জীবন নরক করে দিয়ে।
তাই, স্মাইল পিজ…’

লেখাটি নিয়ে মন্তব্য প্রদান করুন।

Your email address will not be published.